প্রকাশকের কথা
অত্র গ্রন্থটি ইরানের বিশিষ্ট দার্শনিক ও চিন্তাবিদ অধ্যাপক মুর্তাজা মোতাহহারীর মানব পরিচিতিমূলক একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এ গ্রন্থে অধ্যাপক মোতাহহারী মুসলিম বিশ্বে ও পাশ্চাত্য জগতে প্রচলিত বিভিন্ন মতাদর্শের দৃষ্টিতে পূর্ণ মানবের রূপকে তুলে ধরে সেগুলোর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলোকে পর্যালোচনা করেছেন। অতঃপর ইসলামের দৃষ্টিতে একজন পূর্ণ মানবের চিত্র তুলে ধরেছেন। সাধারণত সব সমাজেই দেখা যায় মানুষের গুণাবলির সবগুলো দিককে সমানভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। ইরানের তৎকালীন সমাজও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সত্তরের দশকে ইরানের বুদ্ধিজীবী সমাজ ও চিন্তাবিদদের একাংশ ইসলামের সামাজিক দিকটিকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে এর নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিকটিকে একরকম উপেক্ষা করা শুরু করেছিলেন। আবার এরই কয়েক দশক পূর্বে এ সমাজটি কেবল ইসলামের নৈতিক দিকটি নিয়েই ব্যস্ত ছিল কিন্তু এর সামাজিক দিকটিকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে গিয়েছিল। অধ্যাপক মুর্তাজা মোতাহহারী এ বিষয়টি তুলে ধরেছেন যে, ইসলাম যেমনভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্ম, ঠিক তেমনিভাবে ইসলামের দৃষ্টিতে পূর্ণ মানবও সকল ইতিবাচক মানবিক গুণের সমন্বয়ে গঠিত একজন সুষম বিকশিত মানুষ। ইসলাম মানুষকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করতে চায় যে, সে যেন অপূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ কোনো মানুষ না হয়।
অধ্যাপক মোতাহহারী এমন এক সময়ে গ্রন্থটি রচনা করেছেন যে সময় ইরানের সমাজে ‘মানবতাবাদ’ (হিউম্যানিজম) একটি স্বতঃসিদ্ধ মত হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আদর্শ মানুষ বলতে যা বোঝাতো তা হলো মানবতাবাদের দৃষ্টিতে কাঙ্ক্ষিত মানুষ। মোতাহহারী একজন যুগসচেতন ইসলামী বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিভিন্ন (ইসলাম, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান) দিক থেকে একজন আদর্শ মানুষকে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের চেষ্টা করেছেন। যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে অধ্যাপক মোতাহহারী এ গ্রন্থটি রচনা করেছেন তা হলো তিনি চেয়েছেন ইসলামের দৃষ্টিতে এমন একজন ভারসাম্যপূর্ণ ও ত্রুটিহীন মানুষের পরিচয় তুলে ধরতে যাতে একজন চিন্তাশীল মানুষ বিভিন্ন মতবাদের সাথে তাঁর উপস্থাপিত মানুষকে তুলনা করে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারে। তাই তিনি নিছক ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এটা করেননি। তিনি চেয়েছেন সামগ্রিক দৃষ্টিতে ইসলামের আদর্শ মানুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈশিষ্ট্যগুলোকে তুলে ধরতে। তাঁর উপস্থাপিত আদর্শ মানুষটি বৃদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক, আধ্যাত্মিক, আবেগ-অনুভূতি, ভালোবাসা, মানবপ্রেম শক্তিমত্তা, সাহস, ধৈর্য, সহনশীলতাসহ সকল মানবিক পূর্ণতার অধিকারী। তাই তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির ইসলামের পূর্ণ মানব একজন অনুসরণীয় আদর্শ মানুষ। এ পূর্ণ মানব ইসলামের সকল শিক্ষাকে পূর্ণরূপে তার জীবনে বাস্তবায়িত করেছে। তাঁর নিজের ভাষায় এ মানুষটি ইসলামের পূর্ণ অনুসারী হিসাবে সবসময় সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
অতএব, এ গ্রন্থটি অধ্যয়নে পাঠক ইসলামের দৃষ্টিতে একজন আদর্শ ও পূর্ব মানবের পরিচয় লাভ করবেন। অধ্যাপক মোতাহহারী এ গ্রন্থে ইসলামের পূর্ণ মানবকে এমনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন যিনি স্থান ও কালের উর্ধ্বে একজন আদর্শ মানুষ। এই বইয়ে অধ্যাপক মোতাহহারী অন্য মতবাদগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিতে আদর্শ মানুষের সাথে ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির আদর্শ মানুষের তুলনা করতে গিয়ে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন।
পূর্ণ মানব বা আদর্শ মানুষ বলতে কী বোঝায়? বিভিন্ন মতবাদের দৃষ্টিতে পূর্ণ মানবের সংজ্ঞা কী?
একজন পূর্ণ মানবকে চেনার উপায় কী? এক্ষেত্রে বিভিন্ন মতাদর্শের মানদণ্ড কী?
ইসলাম মানুষের পূর্ণতার জন্য কোন মানদণ্ড প্রবর্তন করেছে এবং ইসলামের দৃষ্টিতে পূর্ণ মানবের বৈশিষ্ট্যগুলো কী?
মানুষের আধ্যাত্মিক ও মানসিক ত্রুটিগুলো কী কী?
মানবপ্রেম ও খোদাপ্রেমের মধ্যে সম্পর্ক কী?
আত্মপরিচিতি ও খোদা পরিচিতির মধ্যে সম্পর্ক কী?
এ গ্রন্থে পূর্ণ মানব সম্পর্কে দর্শন, বুদ্ধিবৃত্তিক মতবাদ, অধ্যাত্মবাদ, ক্ষমতার মতবাদ, অস্তিত্ববাদ, সমাজতন্ত্র, প্রেমের মতবাদ এবং ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে মানবজাতি নৃতত্ত্ব ও মানবিক বিজ্ঞান বিষয়ে সবচেয়ে বড় যে সঙ্কটের মধ্যে পড়েছে তার শীর্ষে রয়েছে মানব পরিচিতি ও আদর্শ মানুষের পরিচয়ের সঙ্কট। এরূপ সময়ে ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড হিউম্যান সাইন্স রিসার্চ, ঢাকা, এই মহান ও বিদগ্ধ লেখক ও চিন্তাবিদের রচিত মানব পরিচিতিমূলক এ গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটি প্রকাশ করতে পেরে খুবই আনন্দিত বোধ করছে। আশা করা যায় এ গ্রন্থটি বাংলাভাষী পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং তাঁদের মানবিক চিন্তার বিকাশ ও আত্মোন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
Reviews
There are no reviews yet.