আশুরার দিনে রোজার পর্যালোচনা:
আশুরার দিনে রোজা পালন ইসলামের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনার একটি| এটা বিভিন্ন দিক থেকে পরীক্ষা করার জন্য পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন|
সর্বপ্রকার মানদন্ডের মাপকাঠিতেই, নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন ইবনে আলীর এই দিনে শহীদ হওয়া প্রকৃতপক্ষে একটি বড় ট্রাজেডি ও হৃদয় বিদারক ঘটনা| কারণ তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা শহীদ হয়েছিলেন শুধু ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবীয়ার (বনু উমাইয়া) অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার কারণে| ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবীয়া (বনু উমাইয়া) ও যিয়াদের পরিবার হুসাইন ইবনে আলী ইবনে আবু তালীবের হত্যার খুশিতে আত্মহারা হয়েছিল| তারা শুধুমাত্র আশুরার দিনটিকে খুশিতে উদযাপন করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি, তারা এই দিনটিকে ‘আনন্দের দিন’ হিসাবে উদযাপন করাটাকে রেওয়াজে পরিণত করল, তাদের পরিবার এবং বন্ধুদের জড়ো করে, ইমাম হুসাইনের হত্যার দিনটিতে আনন্দ উৎসব করতো প্রত্যেক বছর| পরবর্তীতে এটি উদযাপন করা একটি ঐতিহ্যে পরিণত হল|
রোজা ধর্মাচরণের একটি মহান কর্ম, সুফি তরিকা ও পবিত্র আহলে বাইতের অনুসারী উভয়েরই| আশুরার এই দিনে রোজা রাখা নিয়ে তাদের কিছু ˆবধ বিধি আছে| বছরের যে কোন দিন রোজা রাখার নিয়ম বা তাগিদ আছে শুধু ঈদের দিনদ্বয় ব্যতিত| আর আশুরার দিন রোজা রাখার পিছনে রাজনৈতিক একটি ইতিহাস আছে|
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্রকে হত্যা করা জঘন্য অপরাধ ছিল, তাই বনু উমাইয়া আশুরার দিনের এই জঘন্য কাজকে মানুষের মন থেকে মুছার চেষ্টা করতে লাগল| ক্ষমতা এবং টাকার বদৌলতে তারা আশুরার দিনকে একটি খুশি ও বরকতময় দিন হিসাবে মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে| তারা আশুরার দিনের তাৎপর্যকে মুছে দিতে বিভিন্ন হাদিস বর্ণনা শুরু করল| উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো বেশী করে প্রচার করল| যেমন: নবী মুসা (আ.) মুক্তি পেলেন ফেরাউন থেকে, নবী ইব্রাহিম (আ.) বেঁচে গেলেন নমরুদের আগুন থেকে ইত্যাদি ইত্যাদি, তাই এই বরকতময় দিনে আল্লাহর শুকরিয়া জানানোর মাধ্যম হিসাবে তারা আশুরার দিনে রোজা রাখার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করতো বিভিন্ন জাল হাদিস তৈরী করে, যেন ইসলামের জন্য ইমাম হুসাইন ইবনে আলীর কোরবানি মানুষের কাছে ঢাকা পড়ে যায়| আর এভাবেই বনু উমাইয়া রাজতন্ত্রকে ইসলামের ভিতর কায়েম করে দিল আজ পর্যন্ত| ১৪০০ বছর হয়ে গেল এখনও আমরা ইসলামী শাসনতন্ত্র দেখিনি|
এখানে কিছু বানানো হাদিস পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করা হল| আশুরার দিনে রোজা রাখা সম্পর্কিত রাসূল (সা.)-এর কিছু বাণী যা তিনি সম্ভবত বলেননি| যা পরে উমাইয়াদের দ্বারা বানানো হয়েছিল| হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণিত- রাসূলে পাক (সা.) মক্কা থেকে মদিনা হিজরত করলেন, তখন তিনি সেখানকার ইহুদীদের আশুরার দিন রোজা রাখতে দেখলেন| তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন— “তোমরা এই দিনে রোজা রাখছ কেন?” তারা উত্তরে বলল— “এটি একটি বিরাট সম্মানিত দিন| এই দিনে আল্লাহপাক নবী মুসা (আ.) এবং তাঁর উম্মতকে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তাঁর বাহিনীকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করে দেন| তাই নবী মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতা¯^রুপ এ দিনে রোজা পালন করেন বিধায় আমরাও এ দিনে রোজা রাখি|”
এতদশ্রবনে রাসূল (সা.) বলেন— “মুসা (আ.)-এর অনুসরণের ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশী উপযুক্ত| অতঃপর রাসূলে পাক (সা.) নিজে আশুরার দিনে রোজা রাখেন এবং মুমিনদেরও রোজা রাখার হুকুম প্রদান করেন|” [বুখারী ও মুসলিম]
আশুরার রোযা সম্পর্কে এক হাদিসে আছে যে, “তোমরা আশুরার রোজা রাখ এবং ইহুদিদের সাদৃশ্য পরিত্যাগ করে; আশুরার আগে বা পরে আরো একদিন রোজা রাখ|” [মুসনাদে আহমদ, খন্ড-১, হাদীস-২৪১]
উপরোক্ত হাদিসগুলো পরীক্ষা করতে নিন্মে উল্লেখিত সাবধানতা বিবেচনা করা আবশ্যক:
১| হাদিস কখন বর্ণনা করা হয়েছে, কে করেছেন এবং তাদের ব্যক্তিগত পরিচয় কি? এবং কোন বইটিতে?
২| ‘আশুরা’ শব্দের অর্থ কি? এর কি একাধিক অর্থ আছে?
৩| ইহুদি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী, ইসরায়েলী জাতি কি এইদিনে তাদের মুক্তি উপলক্ষে রোজা রাখতো? ঐদিন মহররম মাসের দশ (১০) তারিখ ছিল কি?
৫| কখন থেকে আরবি ক্যালেন্ডার গণনা শুরু হয়? এবং কিভাবে উপরোক্ত হাদিস এই দিনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়?
৬| কেন রাসূল (সা.) ইহুদিদের অনুশীলন নকল করতে যাবেন?
৭| রাসূল (সা.)-এর আর অন্য কি কি সুন্নত আছে যা উপেক্ষিত হয়েছে?
আশুরার রোজা ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক তাৎপর্যকে সমর্থন করে? তার সমসাময়িক গুরুত্বের ক্ষেত্রে, বেশিরভাগ ধর্মপরায়ণ মুসলমান মানুষ আশুরার দিনে রোজা রাখায় ব্যস্ত| কিছু কিছু আলেমের মতে— “রমজানের রোজার পরে আশুরার দিনে রোজা রাখা রাসূলের সবচেয়ে প্রিয় ছিল|” তার সমসাময়িক তাৎপর্যের প্রেক্ষিতে| আশুরায় রোজা রাখা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কারণটা জানা আমাদের দরকার| কখন এই রোজার ভিত্তি উৎপত্তি হয়েছে, এই আমল কি ইসলামের সব মাজহাবের লোকের দ্বারা স্বীকৃত?
আশুরার রোজার এই সুন্নত আমলটি এত বেশী প্রচার করা হয় অথচ পবিত্র নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আরও অনেক সুন্নত আছে যা এর মত এত প্রচার করা হয় না কেন?
যখনই মহরমের ১০ তারিখ আসে, তখনই আলেম ও মসজিদের ইমামরা এইদিনে রোজার ফযিলত ও তাৎপর্য বয়ানের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে| হাজার হাজার লিফলেট, বই, পোস্টার এবং আরো অনেক মিডিয়া যন্ত্রপাতির দ্বারা আশুরাকে কেন্দ্র করে মুসলমানদেরকে ১০ই মহররমে রোজা রাখার জন্য উৎসাহিত করা হয়| আশুরার রোজা ইসলামের ইতিহাসের একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা বলে মনে হয়| যেমন, এ দিনে নবী ইউসুফ (আ.) জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন| নবী ইয়াকুব (আ.) চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছেন| অনেকে বলে, এ দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে| নবী ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন| নবী ইদরীস (আ.)-কে আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে ইত্যাদি| তবুও, কেন এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে? কেন সব কিছু আশুরার রোজাকে কেন্দ্র করে করা হয়?
আপাত: দৃষ্টিতে মনে হয় ইমাম হুসাইন ইবনে আলীর আন্দোলনের তাৎপর্যের গুরুত্ব কমানোই হল এর মূল উদ্দেশ্য| আশুরার রোজার বিধান, নবী মূসা (আ.) এবং ইসরায়েলী জাতির মুক্তির দিন থেকে উৎপত্তি| ইতিহাস এবং হাদিস থেকে এই রোজার আমলকে ব্যাপক বিশ্লেষণ করা দরকার, তা করতে আমাদেরকে ইহুদি ও ইসলামী ক্যালেন্ডার জানা প্রয়োজন|
Reviews
There are no reviews yet.