আবদুল্লাহ ইবনে সাবা ও অন্যান্য কল্পকাহিনী

৳ 220.00

  • আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ও অন্যান্য কল্পকাহিনি
  • লেখক : আল্লামা সাইয়্যেদ মুরতাযা আসকারী
  • অনুবাদ : নূর হোসেন মজিদী
  • সম্পাদনা : মোঃ সামছুল আযম
  • প্রকাশকাল : একুশে বইমেলা ২০১৪
  • প্রচ্ছদ : মজিবুর রহমান ভূইয়া
  • পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২৭২
  • স্বত্ব : আলে রাসূল পাবলিকেশন্স কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
  • ISBN : 978-984-91565-7-4

সূচিপত্র

 অনুবাদকের কথা : ———————————-
১০
 গ্রন্থকার পরিচিতি : ———————————-
 দ্বীনি শিক্ষা ব্যবস্থার পদ্ধতিগত উন্নয়নে পদক্ষেপ গ্রহণ।
 ইল্ম্ ও আমলের মানুষ।
 ইসলামি প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন।
 রাজনৈতিক আন্দোলন।
 বার্ধক্যে ইরানে।
 জ্ঞানের জগতে অবদান। ১৫ – ২৬
 মতামত : ——————————————
 ড. হামিদ হাফ্নী দাউদ।
 শেখ মাহ্মূদ আবু রিয়্যা।
 শেখ জাওয়াদ মুগ¦নীয়্যাহ্।
 প্রফেসর জেম্স্ রবিনসন। ২৭ – ৪২
 উপস্থাপনা : —————————————
 আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার কল্পকাহিনি
 কল্পকাহিনির উৎস
 সাইফ্ কে? (সংক্ষিপ্ত জীবন কাহিনি)
১) ওসামাহ্র বাহিনী
২) সাক্বীফাহ্ : বনি সায়েদাহ্র ছাউনি নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী বনি সায়েদাহ্র সাক্বীফাহ্র কাহিনি ৪৩ – ৪৮

 ভূমিকা : ——————————————
 কীভাবে ও কেন এ গ্রন্থ রচিত হলো ৪৯ – ৫০

 আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার কল্পকাহিনি : —————-
 ঐতিহাসিকদের লেখা কাহিনির সারসংক্ষেপ ৫১ – ৫৭

 কল্পকাহিনির বর্ণনাকারীগণ : ———————– ৫৮ – ৭৩
 সাইফ ও তার রেওয়ায়েত সম্পর্কে পর্যালোচনা : —-
 কে এই সাইফ?
 সাইফের রেওয়ায়েতসমূহ
 ‘ইল্মে রিজালের দৃষ্টিতে সাইফ্ ৭৪ – ৭৭
 প্রসঙ্গ : ওসামাহ্র বাহিনী : ————————
 সাইফের রেওয়ায়েত
 সাইফ ব্যতীত অন্যান্যের রেওয়ায়েত
 সাইফ ও অন্যান্যের রেওয়ায়েতের তুলনা
 ওসামাহ্ বাহিনীর কয়েকজন বিখ্যাত সাহাবি
 মৃত্যুশয্যায় রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ৭৮ – ৮৪
 সাইফ ও সাকীফাহ্র ঘটনা : ———————–
 সাইফের বর্ণিত হাদিসসমূহ
 সাইফের হাদিসের সনদ পরীক্ষা
 সাইফের হাদিসের মূল পাঠ পরীক্ষা
 অন্যান্য ঐতিহাসিকের বর্ণনায় সাকীফাহ্র ঘটনা
 যে আদেশ পালিত হয়নি
 যে ওয়াসিয়্যাত লেখা হয়নি ৮৫ – ৯৬

 রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ওফাত : ———————–
 হযরত ওমর কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ওফাত অস্বীকার
 রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ওফাত অস্বীকারের কারণ কী?
 রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর দাফনের পূর্বে খেলাফতের দাবিদারগণ
 রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর খেলাফতের প্রথম দাবিদার
 রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর খেলাফতের দ্বিতীয় দাবিদার
 তৃতীয় ও সফল দাবিদার
 সাক্বীফায় বিতর্ক
 যেভাবে বাই‘আত সংঘটিত হল
 সাক্বীফাহ্র বাই‘আতের পর ৯৭ – ১১১
 সর্বজনীন বাই‘আত্ : ——————————
 বনু আসলামের বাই‘আত
 সর্বসাধারণের বাই‘আত
 রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর নামাজে জানাযা
 রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর দাফন
 হযরত আবুবকরের খেলাফতের বিরোধীগণ
 হযরত ফাতেমার গৃহে আশ্রয়গ্রহণ
 হযরত আবুবকরের বিচারালয়ে হযরত আলীর বক্তব্য
 হযরত ফাতেমার সংগ্রাম
 বাই‘আতের মাধ্যমে সংগ্রামের সমাপ্তি ১১২ – ১২৭
 বাই‘আত সম্বন্ধে বিশিষ্ট সাহাবিদের মূল্যয়ন : ———
ক) ফায্ল্ ইবনে আব্বাস
খ) আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস
গ) সালমান ফারসী
ঘ) উম্মে মেস্তাহ্
ঙ) আবু যার
চ) মিক্বদাদ বিন্ ‘আম্র্
ছ) বনু নাজ্জারের জনৈকা মহিলা
জ) মু‘আবিয়া
ঝ) খালেদ ইবনে সা‘ঈদ
ঞ) সা‘দ্ ইবনে ‘ইবাদাহ্
ট) ওমর বিন্ খাত্তাব
ঠ) আবু সুফিয়ান ১২৮ – ১৪০
 সাইফের রেওয়ায়েতের পর্যালোচনা : —————
 সাইফের রেওয়ায়েতসমূহের সংক্ষিপ্তসার
 তুলনা ও পর্যালোচনা
 উপসংহার ১৪১ – ১৪৯
 র্ইতিদাদ্ (ইসলাম-ত্যাগ) : ————————
 ইসলামে র্ইতিদাদ্
 রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর যুগে র্ইতিদাদ্
 হযরত আবুবকরের আমলে র্ইতিদাদ্
 হযরত আবুবকরের বিরোধিতা র্ইতিদাদ্ নয়
 যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
 ঐতিহাসিকগণের অভিমত
 সাইফ কী বলে? ১৫০ – ১৬০
 মালেক ইবনে নুওয়াইরাহ্র কাহিনি : —————-
 নির্ভরযোগ্য সূত্রের বর্ণনায় মালেকের ঘটনা
 সাইফের বর্ণনা অনুযায়ী মালেকের ঘটনা
 সাইফের রেওয়ায়েতের উৎস
 সাইফের রেওয়ায়েত কল্পকাহিনি কেন?
 সাইফের কল্পকাহিনির তুলনামূলক পর্যালোচনা ১৬১ – ১৭৫
 ‘আলা ইবনে হায্রামীর কাহিনি : ——————–
 ‘আলা ইবনে হায্রামী সম্পর্কে সাইফের রেওয়ায়েত
 সাইফ ব্যতীত অন্যন্যের রেওয়ায়েতে ‘আলা-র কাহিনি
 পর্যালোচনা ও উপসংহার ১৭৬ – ১৮২
 হাওয়াবের কুকুরদের চিৎকার : ———————-
 সাইফের বর্ণনায় হাওয়াবের কাহিনি
 সাইফের কাহিনির তথ্যসূত্র
 উম্মে র্ক্বিফাহ্র যুদ্ধ ও রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী
 হাওয়াবে কার উদ্দেশে কুকুর ঘেউঘেউ করেছিল?
 উপসংহার

১৮৩ – ১৮৯
 যিয়াদের জন্মপরিচয় সংশোধন : ———————
 সাইফের রেওয়ায়েতে যিয়াদের নসবনামা
 সাইফের রেওয়ায়েতের সনদ
 সাইফ ব্যতীত অন্যান্যের বর্ণনা
 উপসংহার ১৯০ – ১৯৪
 মুগীরাহ্ ইবনে শু‘বাহ্র কাহিনি : ——————–
 সাইফের রেওয়ায়েতে মুগীরাহ্র ব্যভিচার
 সাইফ ব্যতীত অন্যান্যের বর্ণনা
 সাইফের বর্ণিত কাহিনির উৎস
 উপসংহার ১৯৫ – ২০৩
 আবু মাহ্জানের নেশাখোরী : ———————–
 ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় আবু মাহ্জানের ঘটনা
 সাইফের বর্ণনা
 সাইফের বর্ণিত কাহিনির তথ্যসূত্র
 সাইফের রেওয়ায়েতের পর্যালোচনা ২০৪ – ২১০
 শূরা ও হযরত ওসমানের অনুকূলে বাই‘আত : ——–
 সাইফের রেওয়ায়েত
 হযরত ওমর কর্তৃক মনোনীত খলীফা
 শূরা সম্পর্কে সাইফ ব্যতীত অন্যান্যের রেওয়ায়েত
 শূরা গঠনের উদ্দেশ্য
 উপসংহার ২১১ – ২২৫
 হরমুযান-তনয় কুম্মাযবানের কল্পকাহিনি : ————
 সাইফের বর্ণনা
 সাইফ ব্যতীত অন্যান্যের বর্ণনা
 সাইফের রেওয়ায়েতের সনদ
 সাইফের রেওয়ায়েতের মূল পাঠ পর্যালোচনা ২২৬ – ২৩০
 সাইফের কল্পিত দিবসসমূহ : ————————
১) গরুর দিবস; সাইফের রেওয়ায়েত পর্যালোচনা
২-৪) র্আমাছ্, আগ¦ওয়াছ্ ও ‘ইমাছের দিবসসমূহ
সাইফের বর্ণিত কল্পকাহিনির সনদ বিচার
৫) জারাছীমের দিবস
সাইফের বর্ণিত কল্পকাহিনির সনদ
সাইফ ব্যতীত অন্যান্যের বর্ণনা
সাইফ ও অন্যান্যের বর্ণনার তুলনামূলক পর্যালোচনা
৬) ক্রন্দন দিবস
সাইফ ব্যতীত অন্যান্যের বর্ণনা
সাইফের রেওয়ায়েতের সনদ
সাইফের উদ্দেশ্য ২৩১ – ২৪০
 সাইফের কল্পিত শহরসমূহ : ————————-
১) দোলুছ্
২) তাউস্
৩-৪) জি‘রানাহ্ ও না‘মান
৫) কুরদুদাহ্
৬) উৎ নদী
৭-৯) ইরমাছ্, আগ¦ওয়াছ্ ও ‘আমাস্
১০-১১) আল-ছেনী, ছানাইয়াহ্
১২) আল-কুদাইস্
১৩) আল-মার্ক্বা
১৪) ওয়াইয়ার্খোদ্
১৫) ওয়ালাজাহ্
১৬) আল্-হাওয়াফী
বিখ্যাত ভূগোলগ্রন্থাবলিও সাইফের শহর সমূহ ২৪১ – ২৪৬
 সাইফ কর্তৃক ঘটনাবলির তারিখ পরিবর্তন : ———-
১) উবুল্লাহ্ বিজয়
২) বসরা শহর প্রতিষ্ঠা
৩) ইয়ারমুকের যুদ্ধ
৪) ফেহ্লের যুদ্ধ
৫) হেরাক্লিয়াসের সিরিয়া ত্যাগ
৬) বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়
৭) আল্-জাযিরাহ্ বিজয়
৮) ‘আম্ওয়াসের প্লেগ
৯) মুসলিম ও পারসিকদের মধ্যে সংঘর্ষ
১০) খোরাসানের যুদ্ধ
১১) তাবারিস্তানের যুদ্ধ ২৬৭ – ২৫১
 সাইফের রেওয়ায়েতসমূহের ব্যাপক প্রচারের কারণ : —
 সাইফের রেওয়ায়েত বলদর্পীদের পক্ষে
 সাইফের রেওয়ায়েত প্রাচ্যবিদদের পছন্দনীয় ২৫২ – ২৫৫
 উপসংহার : ————————————— ২৫৬

অনুবাদকের কথা

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

বক্ষ্যমাণ গ্রন্থ ইরাকের বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও মুজতাহিদ আল্লামা সাইয়্যেদ মুরতাযা আসকারী প্রণীত চার খ-ে সমাপ্ত একই নামের গ্রন্থের প্রথম খ-ের অনুবাদ। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামটির সাথে বিদ্বৎসমাজ ভালোভাবেই পরিচিত এবং ইসলামের ইতিহাস বা ইসলামি মাজহাবসমূহ সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকদের অনেকেই এ নামটি জানেন। ব্যাপকভাবে প্রচারিত আছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামে জনৈক ইয়ামানী ইয়াহুদি পরিকল্পিত ভাবে ইসলাম গ্রহণ করে ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি ও রক্তক্ষয়ী সংঘাত সৃষ্টি করে এবং শীয়া মাজহাবের জন্ম দেয়।
অবশ্য অতীতে বাংলাভাষী মুসলমানদের শীয়া মাজহাব সম্পর্কে খুব একটা সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। তার কারণ, এ সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে জানার কোনো সুযোগ তাদের সামনে ছিল না। ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংঘটিত হবার পর এ অজানার দেয়াল অপসারিত হয়; আলেম সমাজ, চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীসহ বিভিন্ন স্তরের অসংখ্য বাংলাদেশি মুসলমান স্বল্প বা দীর্ঘ সময়ের জন্যে ইরানে থেকেছেন এবং অধ্যয়ন ও শীয়া মুসলমানদের সাথে ওঠাবসার ফলে তাঁদের চিন্তা, বিশ্বাস ও ধর্মাচরণের সাথে সরাসরি পরিচিত হয়েছেন। অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁদের সকলেই এটা স্বীকার করেন যে, মূলত মুসলমান হিসেবে শীয়া ও সুন্নির মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। যে পার্থক্য আছে তা উভয়ের মধ্যকার দ্বীনি ঐক্যের জন্যে বাধা হতে পারে না। কারণ, তাওহীদ, আখেরাত, খত্মে নবুওয়াত ও কোরআনের ন্যায় মুখ্য বিষয়সমূহের অভিন্নতার মোকাবিলায় অন্য কোনো বিষয়কে কেন্দ্র করেই কোরআন মাজীদে নিষিদ্ধ অনৈক্যের পথে অগ্রসর হওয়া জায়েয হতে পারে না।
অতীতে জানাজানি না-থাকার কারণে শীয়া ও সুন্নির মধ্যে যে দূরত্ব ছিল সাম্প্রতিককালে জানাজানি ও ভাব বিনিময় বৃদ্ধি পাওয়ায় তা বহুলাংশে হ্রাস পেলেও এখনো অনেক সুন্নির মনেই আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা সংক্রান্ত পূর্বে প্রচারিত ধারণা রয়েই গেছে। অর্থাৎ ভাবধারাটা এই যে, শীয়া মাজহাব আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কর্তৃক রচিত হলেও মূলত সুন্নি ও শীয়াদের মৌলিক ধারণা ও বিশ্বাসগুলোর মধ্যে বড় ধরনের কোনো পার্থক্য নেই তথা কেউ অপরকে ইসলাম-বহির্ভূত মনে করে না, অর্থাৎ উভয়ই মুসলমান। অন্যদিকে শীয়া মাজহাবের ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামি চিন্তাবিদগণ সব সময় আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কর্তৃক শীয়া মাজহাব গড়ে তোলার ধারণাকে জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি দালিলিক প্রমাণাদি দ্বারা এটাই তুলে ধরার চেষ্টা করে আসছেন যে, রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ওফাতের পর খেলাফতকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত মতপার্থক্য থেকে মুসলমানদের মধ্যে যে বিভক্তি ও বিভিন্ন ধারার সৃষ্টি হয় এবং আহ্লে বায়তের ইমামগণকে কেন্দ্র করে যে ধারাটি এগিয়ে যায় তা-ই শীয়া ধারা। আর বর্তমান শীয়া ইসনা ‘আশারী (বারো ইমামী শীয়া) তাঁদেরই উত্তরসুরি।
অর্থাৎ শীয়া মনীষীগণ আব্দুল্লাহ্ ইবনে সাবা কর্তৃক শীয়া মাজহাব প্রতিষ্ঠার প্রচারকে প্রত্যখ্যান করলেও ঐ নামের লোকটির অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। কিন্তু আল্লামা আসকারী ইতিহাস ও হাদিস নিয়ে গবেষণা করে এক বিস্ময়কর সত্য উদ্ঘাটন করেছেন। তা হচ্ছে, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কর্তৃক শীয়া মাজহাব প্রতিষ্ঠা তো দূরের কথা, আদৌ এ নামের কোনো লোকই কোনো দিন ছিল না। তিনি দেখতে পান যে, সাইফ বিন্ ওমর নামে জনৈক মিথ্যা হাদিস রচনাকারী ব্যক্তি এ কাল্পনিক চরিত্রটি সৃষ্টি করে তার নামে শীয়া মাজহাব রচনা করার কল্পকাহিনি সাজিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিকগণ সচেতনভাবেই হোক, বা অসাবধানতাবশতই হোক, তা-ই ইতিহাস গ্রন্থে স্থান দিয়েছে।
আল্লামা আসকারী তাঁর প্রতিপাদ্য বিষয়টি প্রমাণ করতে গিয়ে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি ‘ইল্মে রিজালের গ্রন্থাবলির সাক্ষ্যের ভিত্তিতে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, সাইফ বিন্ ওমর ছিল একজন যিন্দিক্ (নাস্তিক) ও মিথ্যা হাদিস রচয়িতা, অতএব, তার রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু তিনি এ ব্যাপারে শুধু ‘ইলমে রিজালের প-িতগণের মতামতের ওপর নির্ভর করেননি। তিনি সাইফ কর্তৃক বর্ণিত রেওয়ায়েতসমূহকে একই ঘটনাবলি সম্পর্কে অন্যান্য নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিকগণের বর্ণনা ও হাদিসের বর্ণনার সাথে তুলনা করে দেখিয়েছেন যে, প্রায় সবগুলো ক্ষেত্রেই সাইফের বর্ণনা অন্য সকলের বর্ণনা থেকে ভিন্ন, যা তার মিথ্যা রেওয়ায়েত রচনাকারী হবার ধারণাকেই প্রমাণিত করে। আল্লামা আসকারী আরো দেখিয়ে দিয়েছেন যে, সাইফ যে সনদ উল্লেখ করেছে অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলির প্রত্যক্ষদর্শী থেকে শুরু করে বর্ণনাকারীদের যে ধারাবাহিকতা উল্লেখ করেছে সেসব ব্যক্তিদের প্রায় সকলেই কল্পিত। কারণ, ‘ইলমে রিজালের গ্রন্থাবলিতে তাদের কোনো উল্লেখ নেই এবং কিছুসংখ্যকের উল্লেখ থাকলেও তাদেরকে অজ্ঞাত পরিচয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যাদের রেওয়ায়েত গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। আর ক্ষেত্র বিশেষে সে প্রকৃত ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করলেও তাঁদের নামে স্বীয় কল্পকথা চালিয়ে দিয়েছে। অতএব, বলাই বাহুল্য যে, এধরনের ব্যক্তির বর্ণিত রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে কোনো মাজহাব সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করা সংগত নয়।
আল্লামা আসকারী বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি তিন খ-ে বিন্যস্ত করেছেন এবং এতে সাইফের সকল গুরুত্বপূর্ণ রেওয়ায়েত ও তার রচিত পুস্তকসমূহ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন যাতে সাইফের অগ্রহণযোগ্যতা সম্বন্ধে সামান্যতম সন্দেহের অবকাশও না থাকে। আর এ গ্রন্থেরই ধারাবাহিকতায় তিনি “দেড়শ কল্পিত সাহাবি” নামক গ্রন্থ রচনা করেছেনÑ যাতে সাইফের রেওয়ায়েতসমূহে সাহাবি হিসেবে উল্লিখিত ও তথ্যসূত্র বলে দাবীকৃত দেড়শ’ কল্পিত ব্যক্তির বাস্তব অস্তিত্বহীনতার বিষয়টি প্রমাণ করেছেন।
বক্ষ্যমাণ গ্রন্থটি আল্লামা আসকারীর “আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা” নামক গ্রন্থের প্রথম খ-ের অনুবাদ। তবে তিনি এ গ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে একটি ভিন্ন ধরনের রচনা পরিকল্পনা অনুসরণ করেছেন যা সাধারণত কাউকে অনুসরণ করতে দেখা যায় না। তিনি অন্যান্য গ্রন্থকারের মতো পুরো বিষয়টির একেকটি দিক একেক খ-ে আলোচনা করেননি; বরং তিনি বিষয়বস্তুর সকল দিকই কিছুটা সংক্ষেপে প্রথম খ-ে আলোচনা করেছেন, অতঃপর পরবর্তী খ-সমূহে প্রতিটি দিকের অন্যান্য অংশ আলোচনা করে একে পূর্ণতা দান করেছেন। যেমন- তিনি সাইফের ব্যক্তিচরিত্র তুলে ধরেছেন অর্থাৎ তার অগ্রহণযোগ্যতা সম্বন্ধে ‘ইলমে রিজালের মনীষীদের ও ঐতিহাসিকদের মতামত তুলে ধরেছেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে সাইফের বর্ণনা এবং হাদিস ও ইতিহাসের বর্ণনার সাথে তার সাংঘর্ষিকতা তুলে ধরেছেন। এ পর্যায়ে তিনি কতক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার ওপরে আলোচনা করেছেন যা থেকে তার মিথ্যাচার সম্পর্কে আর কোনোই সন্দেহ থাকে না। তিনি অপর খ-সমূহে একই ধরনের অবশিষ্ট ঘটনাসমূহ সম্পর্কে সাইফের ও অন্যদের রেওয়ায়েতের মধ্যে তুলনা করেছেন যা তার সম্পর্কে আল্লামা আসকারীর মতামতকে আরো সুদৃঢ় করেছে।
‘যা-ই হোক, মোদ্দাকথা, পুরো গ্রন্থটি অনূদিত না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পাঠকদের সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। তবে ভবিষ্যতে গ্রন্থটির অবশিষ্ট খ-সমূহ ও “দেড়শ কল্পিত সাহাবি” গ্রন্থ অনূদিত হলে পাঠকদের পক্ষে এ বিষয়ে স্বীয় জ্ঞানভা-ারকে অধিকতর সমৃদ্ধ করা সম্ভব হবে।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি কথা উল্লেখ না করলে নয়। তা হচ্ছে, সাইফের মিথ্যাচার প্রমাণ করতে গিয়ে গ্রন্থকার বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থ ও নির্ভরযোগ্য ইতিহাসগ্রন্থসমূহ থেকে একই ঘটনাবলি সম্পর্কিত বর্ণনাসমূহ উদ্ধৃত করে উভয়ের মধ্যকার পার্থক্য তুলে ধরেছেন। কিন্তু এর ফলে মুসলিম ইতিহাসের বহু অবাঞ্ছিত ও তিক্ত ঘটনা সামনে এসে যাচ্ছে যদিও সেসব ঘটনা উপস্থাপন করা মূল লক্ষ্য নয়। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই যে, ঐতিহাসিক ঘটনাবলি যতই অবাঞ্ছিত ও তিক্ত হোক-না কেন তাকে মুছে ফেলার কোনো উপায় নেই। অন্তত মূল গ্রন্থাবলিতে যখন তা রয়েছে তখন যে কেউ তা পড়লেই তাঁর নিকট এসব ঘটনা পরিষ্কাররূপে ধরা পড়তে বাধ্য। আর বর্তমান সহজ প্রচার ব্যবস্থার যুগে এমন সব প্রাচীন তথ্যসূত্র সাধারণ পাঠকদেরও আওতায় এসে গেছে যা এখন থেকে অর্ধশতাব্দী আগেও অনেক প-িত ব্যক্তিরও আওতাধীন ছিল না। তাই এ বিষয়টিকে সহজভাবে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। কারণ, নিঃসন্দেহে ঐসব অবাঞ্ছিত বিষয় সামনে আসার ভয়ে ইতিহাসের সত্য-মিথ্যার বিশ্লেষণ বন্ধ রাখা এবং মিথ্যাকে সত্য বলে চলতে দেয়া উচিত বলে কেউ দাবি করবেন না।
দ্বিতীয়ত আমাদের মনে রাখতে হবে যে, ইতিহাস আলোচনা করতে গিয়ে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সম্পর্কিত অবাঞ্ছিত ঘটনা প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে তাঁদের কেউ নবী-রাসূল ছিলেন না এবং ভুল ও অন্যায় থেকে আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে বিশেষ সংরক্ষণের অধিকারী ছিলেন না। অতএব, তাঁদের দ্বারা এমন কিছু হতেই পারে, কিন্তু এ কারণে তাঁদের অন্যান্য গুণাবলি ও অবদানের গুরুত্ব হারিয়ে যায় না। অর্থাৎ তাঁদেরকে তাঁরা যা ছিলেন সে হিসেবেই গ্রহণ করতে হবে; তাঁদের কাউকে ফেরেশতা বা শয়তান বানানোর চেষ্টা করা ঠিক নয়।
মূল গ্রন্থটি আরবি ভাষায় রচিত এবং আরবি থেকে ফার্সি ও আরো অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। গ্রন্থটির প্রথম খ-ের ইংরেজি অনুবাদে কিছু গৌণ ও আলঙ্কারিক বক্তব্য সংক্ষেপণ করা হয়েছে। তবে তাতে লেখকের কোনো বক্তব্য পুরোপুরি বাদ পড়েনি। আয়তনের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ইংরেজি অনুবাদ দৃষ্টে বাংলা অনুবাদেও কিছুটা সংক্ষেপণ করা হয়েছে, যদিও বাংলা অনুবাদ ফার্সি থেকে করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি যে, গ্রন্থকারের পরিচিতি গ্রন্থটির ইংরেজি অনুবাদ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে।
পাঠকগণ লক্ষ করবেন যে, একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ হিসেবে এতে প্রচুর পরিমাণে তথ্যসূত্র ব্যবহার করা হয়েছে। মূল গ্রন্থে তথ্যসূত্রাদির কতক পাদটীকায় স্থান দেয়া হয়েছে এবং কতক মূল পাঠের (ঞবীঃ Ñ متن) ভিতরেই লেখা হয়েছে; পঠনের গতিশীলতার স্বার্থে অনুবাদে সকল তথ্যসূত্র পাদটীকায় স্থান দিয়েছি। তবে গ্রন্থের আয়তনের কথা মাথায় রেখে অনুবাদে কতক পাদটীকা বাদ দিয়েছি বা সংক্ষেপ করেছি। যেসব ক্ষেত্রে একটি তথ্যের তথ্যসূত্র অনেক সেসব ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্রগুলো উল্লেখ করাকেই যথেষ্ট গণ্য করেছি, তবে প্রায়ই সংক্ষেপণের কথা উল্লেখ করেছি।
কতক বহুল প্রচলিত নামের ক্ষেত্রে প্রচলিত বানানের ব্যবহারের ব্যতিক্রমসহ নামসমূহের ক্ষেত্রে সঠিক আরবি উচ্চারণ প্রতিফলিত করার জন্যে সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করেছি, যদিও কতক সীমাবদ্ধতার কারণে সকল ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে আরবি ও ফার্সি ভাষায় স্বরচিহ্ন উচ্চারিত হলেও লেখায় তার ব্যবহার নেই। এ কারণে কিছু নামের উচ্চারণ সঠিকভাবে নির্ণয় করতে না পারার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। তবে কতক নামের ক্ষেত্রে ইংরেজি অনুবাদের সাহায্য নিয়েছি, যদিও সেক্ষেত্রেও উচ্চারণের যথার্থতার নিশ্চয়তা প্রদান করা অত্যন্ত কঠিন। যা-ই হোক, এ ব্যাপারে বিজ্ঞ পাঠকগণ ভুল ধরিয়ে দিলে পরবর্তী সংস্করণে শুধরে নেয়ার চেষ্টা করা হবে, ইনশা আল্লাহ্।
সবশেষে গ্রন্থটি পাঠকদের মধ্যে ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সক্ষম হলেই আমার শ্রম সার্থক বলে গণ্য করব।

বিনীত

নূর হোসেন মজিদী

ঢাকা
১৬ সফর ১৪২৯ হিজরি
১২ ফাল্গুন ১৪১৪ বঙ্গব্দ
২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ খ্রিস্টাব্দ

 

উপস্থাপনা

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার কল্পকাহিনি
ঐতিহাসিকদের মতে, খলিফা হযরত ওসমানের শাসনামলে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা নামে জনৈক ইয়াহুদি মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ-বিসংবাদ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ইসলাম গ্রহণ করে। এ ব্যক্তি মুসলমানদের মধ্যে নিম্নলিখিত চিন্তা-বিশ্বাস ছড়িয়ে দেয় Ñ
ক) রাসূলে আকরাম (সা.) পুনরুত্থিত হবেন।
খ) সব নবী ও রাসূলেরই (আ.) উত্তরাধিকারী ছিলেন; আর হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর উত্তরাধিকারী তাঁর চাচাতো ভাই ও জামাতা হযরত আলী। কিন্তু খলিফা ওসমান তাঁকে তাঁর ঐশী দায়িত্ব গ্রহণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছেন। অতএব, ওসমানের বিরুদ্ধে ও আলীর অনুকূলে বিদ্রোহ করা অপরিহার্য।
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা “সাবাইয়্যাহ্” নামে একটি দল গঠন করে এবং এ দলটি তৃতীয় খলিফা ওসমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এরপর বসরার নিকটে উটের যুদ্ধের (জঙ্গে জামাল) সময় হযরত আলী ও তাঁর শত্রু ত্বাল্হার মধ্যে যখন শান্তি-আলোচনা চলছিল ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল তখন সে দুর্বৃত্তপনার আশ্রয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে গোলযোগ বাঁধিয়ে দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করে দেয়। সাবায়ীরা ইতঃপূর্বেই পরিকল্পিতভাবে উভয় সৈন্যদলেই যোগদান করেছিল। তারা সেনাপতিদের আদেশের জন্যে অপেক্ষা না করেই অতি প্রত্যুষে প্রতিপক্ষের দিকে তির নিক্ষেপ করতে শুরু করে এবং এর ফলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অতএব, দেখা যাচ্ছে যে, মুসলমানদের মধ্যে যত রকমের অপকর্ম ও যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে সে জন্য এই ইয়াহুদি লোকটিই দায়ী।
কল্পকাহিনির উৎস
আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার গল্প দীর্ঘ বারো শ’ বছরের পুরনো। একের পর এক ঐতিহাসিকগণ ও লেখকগণ এ কাহিনি লিপিবদ্ধ করেছেন এবং এতে নতুন নতুন উপাদান যোগ করেছেন।
সব ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে একমত যে, এ কাহিনিটি সর্বপ্রথম সাইফ কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে।
নিম্নোক্ত ঐতিহাসিকগণ এ কাহিনিটি সরাসরি সাইফের রেওয়ায়েত থেকে গ্রহণ করেছেন Ñ
১) ইবনে জারীর ত্বাবারী।
২) যাহাবী; তিনি ত্বাবারী থেকেও উদ্ধৃত করেছেন।
৩) ইবনে আবি বাক্র্; তিনি ইবনে আছীর থেকেও উদ্ধৃত করেছেন
Ñ যিনি ত্বাবারী থেকে উদ্ধৃত করেছেন।
৪) ইবনে ‘আসাকের।

নিম্নাক্ত ঐতিহাসিকগণ কাহিনিটি পরোক্ষভাবে সাইফ থেকে বর্ণনা করেছেনÑ
৫) নিকলসন; তিনি ত্বাবারী থেকে উদ্ধৃত করেছেন।
৬) এনসাইক্লোপেডিয়া অব ইসলাম; ত্বাবারী থেকে।
৭) ভন ফ্লোটন; ত্বাবারী থেকে।
৮) ওয়েরহাউযেন; ত্বাবারী থেকে।
৯) মিরখান্দ্; ত্বাবারী থেকে।
১০) আহ্মাদ আমীন; ত্বাবারী ও ওয়েলহাউযেন থেকে।
১১) ফারীদ ওয়াজ্দী; ত্বাবারী থেকে।
১২) হাসান ইবরাহীম; ত্বাবারী থেকে।
১৩) সাঈদ আফগ¦ানী; ত্বাবারী থেকে এবং সেই সাথে ইবনে আবি বাক্র্,
ইবনে ‘আসাকের ও ইবনে বাদ্রান থেকে।
১৪) ইবনে খালদুন্; ত্বাবারী থেকে।
১৫) ইবনে আছীর; ত্বাবারী থেকে।
১৬) ইবনে কাছীর; ত্বাবারী থেকে।
১৭) ডোনাল্ডসন; নিকলসন ও এনসাইক্লোপেডিয়া অব্ ইসলাম থেকে।
১৮) গিয়াসুদ্দীন; মীরখান্দ্ থেকে।
১৯) আবূল্ ফিদা; ইবনে আছীর থেকে।
২০) রাশীদ রেযা; ইবনে আছীর থেকে।
২১) ইবনে বাদ্রান্; ইবনে ‘আসাকের থেকে।
২২) বোস্তানী; ইবনে কাছীর থেকে।
উপরিউক্ত তালিকা থেকে সুস্পষ্ট যে, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা-সংক্রান্ত কল্পকাহিনি সাইফ কর্তৃক সূচিত হয়েছে এবং প্রথমত ত্বাবারী কর্তৃক উদ্ধৃত হয়েছে। অতএব, এ কাহিনির গ্রহণযোগ্যতা বা অগ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে নিশ্চত হতে হলে অবশ্যই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সাইফের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ও জীবনেতিহাস অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ করতে হবে।
সাইফ্ কে? (সংক্ষিপ্ত জীবনকাহিনি)
সাইফ ইবনে ওমর তামীমী হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীতে (খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দীতে) জীবনযাপন করে এবং হিজরি ১৭০ সালে (৭৫০ খ্রি) মৃত্যুবরণ করে। তার লিখিত দু’টি বই-এর সন্ধান পাওয়া যায় Ñ
১) আল্-ফুতূহ্ ওর্য়া-রিদ্দাহ্। এটি হচ্ছে রাসূলে আকরাম (সা.)-এর ইন্তেকালের পূর্ববর্তী সময় থেকে শুরু করে তৃতীয় খলিফা হযরত ওসমানের খিলাফতে অধিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত সময়কার ইতিহাস।
২) আল্-জামালু ওয়াল্-মাসীরি ‘আয়িশাতা ওয়া ‘আলী। এটি হচ্ছে খলিফা ওসমানের হত্যাকা- থেকে শুরু করে জঙ্গে জামাল (উটের যুদ্ধ) পর্যন্ত সময়কার ইতিহাস।
এ দু’টি বইয়ে সত্য ঘটনার তুলনায় কল্পকাহিনিই বেশি স্থানলাভ করেছে। এতে যেমন কতগুলো বানানো কিচ্ছা-কাহিনি সন্নিবেশিত করা হয়েছে, তেমনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে কতক সত্য ঘটনাকে বিকৃত আকারে ও উদ্ভটভাবে পরিবেশন করা হয়েছে।
যেহেতু সাইফ তার পুস্তক দু’টিতে অনেক সাহাবির নামোল্লেখ করেছে এবং সাহাবি পরিচয়ে কতক কল্পিত চরিত্রকেও অন্তর্ভুক্ত করেছে সেহেতু এ দু’টি পুস্তক ইসলামের প্রথম যুগের ইতিহাসকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছে। উস্দুল্ গ¦াবাহ্, ইস্তিয়াব্ ও আল-ইছাবাতু ফী তামীযিছ্ ছাহাবাহ্-র গ্রন্থকারগণ সহ অনেক জীবনী গ্রন্থকার এবং মু‘জামুল্ বুল্দান্ ও র্আ-রাওযুল্ মি’র্তা-এর গ্রন্থকারসহ অনেক ভূগোল গ্রন্থকার এমন কতক সাহাবির জীবনকাহিনি লিখেছেন এবং এমন কতক জায়গার নাম উল্লেখ করেছেন যাদের ও যেসব জায়গার নাম কেবল সাইফের পুস্তকেই রয়েছে। এসব কারণে সাইফের জীবন ও চরিত্র সম্বন্ধে অবশ্যই বিস্তারিতভাবে ও সতর্কতার সাথে অনুসন্ধান চালানো অপরিহার্য।
সাইফের জীবন ও চরিত্র সম্বন্ধে অনুসন্ধানের ফলাফল যা পাওয়া যায় তা হচ্ছে এই যে, সে ছিল এমন একজন ব্যক্তি যে বিশ্বাস করত যে, বস্তুগত প্রপঞ্চসমূহের বাইরে কোনো জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয় এবং সে ছিল একজন অনির্ভরযোগ্য কাহিনিকার। তার বর্ণিত কাহিনিগুলো পুরোপুরি সন্দেহপূর্ণ এবং সেগুলো পুরোপুরি বা আংশিকভাবে মিথ্যা রচনা। তার বর্ণিত কাহিনিগুলোর কয়েকটি নিম্নরূপ Ñ
১) ওসামাহ্র বাহিনী
রাসূলে আকরাম (সা.) সিরিয়ায় পাঠানোর জন্যে একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। এ বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন উসামাহ্। এ বাহিনীর সর্বশেষ দলটি মদীনা নগরীর মুয়াত্ (নগরীর শেষ সীমারেখা) ত্যাগ করার আগেই রাসূলে আকরাম (সা.) ইন্তেকাল করেন। তাই ওসামাহ্ রাসূলে আকরাম (সা.)-এর উত্তরাধিকারী হযরত আবুবকরের নিকট থেকে যুদ্ধে গমনের অনুমতি আনার জন্যে হযরত ওমরকে তাঁর নিকট পাঠান। সেই সাথে হযরত ওমর কয়েকজন আনসারের দেয়া এ প্রস্তাবও তাঁর কাছে নিয়ে যান যে, যুদ্ধের সেনাপতির পদ থেকে যেন ওসামাহ্কে সরিয়ে দেয়া হয়। হযরত আবুবকর এ প্রস্তাব শোনার সাথে সাথে লাথে লাফ দিয়ে ওঠেন এবং হযরত ওমরের দাড়ি টেনে ধরেন ও তাঁকে অপদস্থ করেন এবং বলেন যে, “রাসূলুল্লাহ্ ওসামাহ্কে সেনাপতি নিয়োগ করে গেছেন; আমি তাকে পরিবর্তন করব না।” এরপর তিনি ওসামাহ্র বাহিনীকে তৎক্ষণাৎ রওয়ানা হয়ে যাওয়ার জন্যে আদেশ দেন এবং হযরত ওমরকে এই বলে অভিশাপ দেন, “তোমার প্লেগ হোক।”
কিন্তু সমকালীন অন্যান্য ইতিহাসবিদগণ এ ঘটনাকে ভিন্নভাবে লিখেছেন।
২) সাক্বীফাহ্ : বনি সায়েদাহ্র ছাউনি
সাইফ বলে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) যেদিন ইন্তেকাল করেন সেদিন একমাত্র ইসলাম-ত্যাগীরা ছাড়া মুহাজিরদের মধ্যকার সকলেই হযরত আবুবকরকে রাসূলূল্লাহ্ (সা.)-এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে সমর্থন করে। হযরত আবুবকরের নির্বাচিত হওয়ার সংবাদ হযরত আলীকে এতই উচ্ছ্বসিত করে তোলে যে, তিনি কেবল তাঁর জামা গায়ে দিয়ে (‘আবা ও ক্বাবা’ নামক ওপরে পরার মজলিসী পোশাক ছাড়াই) বেরিয়ে আসেন। তিনি বন্ধুত্বপূর্ণভাবে হযরত আবুবকরের সাথে মোছাফাহা করেন এবং এরপর যখন তাঁর পোশাক নিয়ে আসা হয় তখন তিনি তা পরিধান করেন এবং হযরত আবুবকরের পাশে বসে পড়েন। সাইফ আরো লিখেছে, হযরত আবুবকর দাবি করেন যে, তাঁর আত্মার মধ্যে একটি শয়তান রয়েছে, তাই মুসলমানরা যেন সব সময় তাঁর দিকে দৃষ্টি রাখে এবং তিনি অবিচার করলে তা যেন প্রতিহত করে।
সাইফ সাক্বীফাহ্ সম্পর্কে সাতটি কাহিনি বর্ণনা করেছে। এসব গল্পে এমন তিনজন লোককে নায়কের ভূমিকায় দেখানো হয়েছ্ েযাদের মধ্যে সাহাবির নামও রয়েছে, অথচ সাইফের পুস্তক ছাড়া সমকালীন অন্য কোনো সূত্রে তাদের নামোল্লেখ নেই। এ অদ্ভুত বিষয়টি যে কাউকেই চিন্তা করতে এবং তার বর্ণিত কাহিনিগুলো সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করতে বাধ্য করে। আহ্লে সুন্নাতের দ্বীনি নেতৃবৃন্দের নিকট নির্ভরযোগ্য বলে পরিগণিত গ্রন্থাবলিতে অনুসন্ধান চালালে সাক্বীফাহ্র ঘটনা লিপিবদ্ধ করণে সাইফের সত্য থেকে বিচ্যুত হওয়ার বিষয়টি খুব সহজেই ধরা পড়ে।
নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী বনি সায়েদাহ্র সাক্বীফাহ্র কাহিনি
রাসূলে আকরাম (সা.) তাঁর অন্তিম শয্যায় একটি ওয়াসিয়্যাত করার ইচ্ছা করেন। কিন্তু হযরত ওমর তার বিরোধিতা করেন এবং এ অবস্থায় নবী করীম (সা.) ইন্তেকাল করলে তিনি লোকদেরকে রাসূলুল্লাহ্র (সা.) ওফাতের সংবাদ প্রচারের বিরুদ্ধে হুমকি দেন। এমতাবস্থায় হযরত আবুবকর সেখানে আগমন করেন। তখন হযরত ওমর সহসাই শান্ত হয়ে যান। রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর আহ্লে বাইত যখন তাঁর কাফন-দাফনের কাজে ব্যস্ত তখন আনসারগণ সা‘দ ইবনে ‘ইবাদাকে নবী করীম (সা.)-এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে নির্বাচিত করার জন্যে একটি ছাউনির (সাক্বীফাহ্) নিচে সমবেত হন। তখন হযরত ওমর, হযরত আবুবকর ও তাঁদের বন্ধুরা ঐ সভায় যোগদান করার জন্যে সেখানে ছুটে যান। শেষ পর্যন্ত হযরত আবুবকরকে খলিফা নির্বাচিত করা হয় এবং উপস্থিত সাহাবিগণ তাঁর অনুকূলে শপথ গ্রহণ করেন। এরপর সমবেত জনতা হযরত আবুবকরের অনুকূলে সাধারণ ও সর্বজনীন আনুগত্য শপথের (বাই‘আত) জন্যে সেখান থেকে মসজিদে চলে যান। এ পুরো সময়ই রাসূলে আকরাম (সা.)-এর দেহ মোবারক তাঁর গৃহেই ছিল এবং সেখানে কেবল তাঁর আহ্লে বাইত ও আনসারদের মধ্য থেকে স্বল্পসংখ্যক সাহাবি উপস্থিত ছিলেন।
উপরিউক্ত ছাউনিতে ও মসজিদে আবুবকরের অনুকূলে শপথ অনুষ্ঠানের পর লোকেরা রাসূলে আকরাম (সা.)-এর গৃহে গমন করেন এবং তাঁর নামাজে জানাযায় অংশগ্রহণ করেন। এ পুরো সময়টাই অর্থাৎ সোমবার দুপুর থেকে শুরু করে মঙ্গলবার মধ্যরাতে দাফনের পূর্ব পর্যন্ত তাঁর দেহ মোবারক তাঁর বিছানায় ছিল।
কেবল আহ্লে বায়তের সদস্যরাই রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর গোসল, কাফন পরানো ও দাফনের পুরো প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত ছিলেন। হযরত আলী এবং বনি হাশেম [রাসূলে আকরাম (সা.)-এর চাচাতো ভাইগণ] হযরত আবুবকরকে রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং তাঁরা নবী-কন্যা হযরত ফাতেমা-এর গৃহে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তখন হযরত ওমর তাঁদেরকে হযরত আবুবকরের অনুকূলে শপথ গ্রহণ করানোর লক্ষ্যে মসজিদে নিয়ে যাওয়ার জন্যে সেখানে গমন করেন। কিন্তু তাঁরা হযরত ফাতেমার জীবদ্দশায় হযরত আবুবকরের অনুকূলে শপথ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। ছয় মাস পর হযরত ফাতেমা (আ.) ইন্তেকাল করেন। অতঃপর হযরত আলী ও বনি হাশেম হযরত আবুবকরকে খলিফা হিসেবে মেনে নেন এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন।
উপরিউক্ত ঘটনাবলি, এ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আবু যার, মিকদাদ, আবু সুফিয়ান, মু‘আবিয়া ও ওমর ইবনে খাত্তাবের মূল্যায়ন, সা‘দ ইবনে ‘ইবাদার বৃদ্ধ বয়সের ঘটনাবলির সংক্ষিপ্তসার এবং এসব ঘটনা সম্পর্কে সাইফের বর্ণনা ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রসমূহের বর্ণনার মধ্যকার তুলনামূলক আলোচনা অত্র গ্রন্থে স্থানলাভ করেছে।
এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, কীভাবে সাইফ সমকালীন সরকারকে সন্তুষ্ট করার জন্যে মনগড়াভাবে সাহাবিদের জীবন-চরিত রচনা করেছে এবং সাধারণ মানুষের মনমানসকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। ইসলামের ইতিহাসকে উপহাস করার লক্ষ্যে সাইফ তার মনগড়া মতামতের কাল্পনিক সাক্ষী-প্রমাণ রচনা করেছে।
অনেক শতাব্দী যাবৎ সাইফের রচিত কল্পকাহিনিসমূহ ইসলামের ইতিহাস হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। রাসূলে আকরাম (সা.), তাঁর আহ্লে বাইত ও তাঁর সাহাবিগণের সঠিক ইতিহাস পর্যালোচনার মাধ্যমে ইসলাম যে রকম ঠিক সে রকম হিসেবে ইসলামকে উপস্থাপনের লক্ষ্যে এখন সাইফ ও তার সূত্রসমূহের ওপর থেকে পর্দা সরিয়ে দিয়ে তার স্বরূপ তুলে ধরার সময় এসেছে। আমাদের জন্যে সাইফ ও তার কল্পকাহিনিসমূহের সপক্ষে কথা বলা বা ইসলামি হাদিসের নামে সেগুলোকে রক্ষা করা কিছুতেই উচিত হবে না। কেননা তাহলে ইসলামি সত্যের প্রচারের বিরোধিতার মাধ্যমে কার্যত আমরা ইসলামেরই ক্ষতিসাধন করব।

Reviews

There are no reviews yet.

Be the first to review “আবদুল্লাহ ইবনে সাবা ও অন্যান্য কল্পকাহিনী”

Your email address will not be published.

Quality
Price
Service